আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ২০২৪
প্রবাসীর অধিকার, আমাদের অঙ্গীকার, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ, আমাদের সবার
এই
প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনায় উদযাপিত
হচ্ছে আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ও জাতীয় প্রবাসী দিবস-২০২৪।১৯৯৯ সালের জাতিসংঘের
সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর এই দিবসটি উদযাপিত হয়ে
থাকে। সারা বিশ্বের অভিবাসী কর্মীদের ত্যাগ, অবদান ও কষ্টের কথা স্মরণ করে এই
দিনটি উদযাপিত হয়। বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সাল থেকে এই দিবসটি জাতীয়ভাবে পালন করে
আসছে। এই বছর আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস ও জাতীয় প্রবাসী দিবস একই সাথে উদযাপিত
হচ্ছে। এ দিবসকে সামনে রেখে জাতীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নানারকম কর্মসূচি গ্রহণ
করা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে রাজবাড়ী জেলা অনুষ্ঠিত আজকের এই র্যালি ও র্যালি
পরবর্তী আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত সম্মানিত সবাইকে অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম
(ওকাপ) এর পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।
সম্মানিত
উপস্থিতি,
আপনারা
জানেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৫ম অবস্থানে থাকলেও রেমিটেন্স
আহরণের ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান ৭ম বা ৮ম। এর অন্যতম কারণ হলো ভাষার দক্ষতা না থাকা,
প্রশিক্ষণের অভাব এবং বৈধ কাগজপত্র না থাকা। আমরা জানি, প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে
গড়ে প্রায় ১০ লক্ষ মানুষ কাজের জন্য বিদেশে যায়। গত বছর ২০২৩ সালে প্রায় ১৩ লক্ষ
৩৩ হাজার মানুষ বিভিন্ন কাজের জন্য বিদেশে গেছে, যার মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার নারী
অভিবাসী কর্মী। তবে দেশের বাইরে যাওয়ার আগে রেজিস্ট্রেশনের নিয়ম থাকলেও কতজন এখন
পর্যন্ত বিদেশ থেকে ফেরত এসেছে তার যথাযথ কোনো হিসাব নেই। এছাড়া, কতজন মানুষ
বিভিন্ন ধরণের অসুস্থতা নিয়ে দেশে ফেরত এসেছে বা কতজন মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে তার
সঠিক কোনো পরিসংখ্যানও নেই। ওয়েজ আর্নাস কল্যাণ বোর্ডের তথ্যমতে, ২০২২ - ২৩
অর্থবছরে প্রায় ৪,১৪৩ জনের মৃতদেহ বাংলাদেশে এসেছে, যাদের গড় বয়স ২০-৩৫ বছরের
মধ্যে।
সম্মানিত
উপস্থিতি,
আমরা জানি আমাদের অর্থনীতি পুরোপুরি রেমিটেন্স নির্ভর। প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২২
বিলিয়ন ডলার আমাদের অভিবাসী কর্মীরা দেশে পাঠান। তাদের কষ্টার্জিত অর্থই আমাদের
অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি।
আমরা যদি একটু গভীরভাবে চিন্তা করি, যাদের কষ্টে আজ আমরা এই জায়গায় পৌঁছেছি, তাদের
জন্য আমরা এবং রাষ্ট্র আসলে কতটুকু করতে পারছি?
যেমন, বিদেশে
যাওয়ার প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি দালাল নির্ভর। একজন মানুষ সঠিকভাবে ন্যায্য খরচে
কখনোই বিদেশে যেতে পারে না। তাদের বিভিন্ন দালালের কাছে ঘুরতে হয় এবং শত শত অভিবাসী
কর্মীকে প্রতারণার শিকার হতে হয়। রিক্রুটিং এজেন্সি এবং তাদের সাব এজেন্টরা কোনো
চুক্তিপত্র বা ডকুমেন্টস প্রদান করে না। ফলে লেনদেনের কোনো প্রমাণপত্র থাকে না।
আবার দেখা
যায়, অনেক মানুষ বিদেশে যাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো চাকরি না পেয়ে দেশে ফেরত
আসতে বাধ্য হচ্ছে। অথচ তারা বিএমইটি’র নিয়ম মেনেই বিদেশে গেছে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে,
তারা বিদেশে গিয়ে কাজ পাচ্ছে না কেন? এর জন্য আসলে কারা দায়ী ?? আবার যারা
অসফলভাবে বিদেশ থেকে ফেরত আসে সমাজ তাকে ভালোভাবে মেনে নিতে পারিনা। এমনকি নিজের
পরিবারও তাদেরকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনা। সমাজের একটি বড় অংশ এখনও নারী অভিবাসী কর্মীদের প্রতি
নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। অথচ তাদের পাঠানো রেমিটেন্সই দেশের অর্থনীতির প্রবাহ
সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
আমরা, ওকাপ, ২০০৪ সাল থেকে অভিবাসন এবং মানব পাচার প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করছি।
বর্তমানে আমরা প্রায় ১৭টি অভিবাসন প্রবণ জেলায় এবং ৩৫টি উপজেলায় বিভিন্ন প্রকল্পের
অধীনে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছি। ওকাপ তার কর্ম এলাকায় প্রতিটি ইউনিয়নে অভিবাসী
ফোরাম কমিটি গঠন করে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। এই ফোরাম মেম্বাররা স্থানীয় পর্যায়ে
জনগণের মাঝে সচেতনতা তৈরি, প্রতারিত অভিবাসীদের ক্ষতিপূরণ আদায় এবং কল্যাণ বোর্ডের
অধীনে সরকারি সেবাপ্রাপ্তিতে সহায়তা করে। এছাড়াও আমরা যারা বিদেশে যাওয়ার
পরিকল্পনা করছেন তাদের জন্য বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম যেমন—বাড়ি বাড়ি গিয়ে
তথ্য প্রদান, প্রাক সিদ্ধান্তমূলক প্রশিক্ষণ, উঠান বৈঠক, আউটরিচ ক্যাম্পেইন সহ
অভিবাসী কর্মীদের এয়ারপোর্ট পিক আপ সাপোর্ট, স্বাস্থ্য সহায়তা, শেল্টার হোম
সাপোর্ট এবং তাদের জীবন দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণসহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক
পুনর্বাসনে সহায়তা করছি। আমরা জেলা জনশক্তি ও কর্মসংস্থান অফিস, টিটিসি, ওয়েলফেয়ার
সেন্টার, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকসহ অভিবাসন সম্পর্কিত সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে
সম্পৃক্ত হয়ে কাজ করছি।
রাজবাড়ী
জেলায় ওকাপ এখন পর্যন্ত ১৫ জন (১৪ জন পুরুষ ও ১ জন নারী) মানব পাচারের ভিক্টিমকে
শনাক্ত করতে পেরেছি। ২ জন কাউন্সেলিং সেবা পেয়েছেন, ৪ জনকে উদ্যক্তা উন্নয়ন
প্রশিক্ষণ দিয়েছি।
১২
ইউনিয়নে কাজ করছি। তাঁর মধ্যে ১০টি ইউনিয়নে মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটির গঠন
অনুষ্ঠিত হয়েছে ও ৫ টি ইউনিয়নে সিটিসি গঠনের পরবর্তিতে কোয়ার্টারলি মিটিং হয়েছে।
আমরা রাজবাড়ী
জেলা প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞ, আমাদের কার্যক্রম বাস্তবায়নে সার্বিক সহযোগিতা
প্রদান করার জন্য। আশা করি, আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অভিবাসীদের অধিকার
রক্ষা করা সম্ভব হবে। সর্বোপরি, অভিবাসীদের জন্যে দেশে ও বিদেশে একটি সহায়ক পরিবেশ
তৈরি হবে।
0 Comments